Just a 14-year journey. But tomorrow is a very special day for Mojar School.
মাত্র ১৪ বছরের একটি যাত্রা। আগামীকাল মজার ইশকুল (Mojar School)-এর জন্য একটি বিশেষ দিন। আমি মনে করি, এটি শুধু একটি দিনের উদযাপন নয়—এটি সেই দিন, যখন আমরা বহু বছরের জমে থাকা প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারব।
এই সময়টাতে আমি ভাবি, অবাক হই, ভিতরে এক ধরনের থ্রিল অনুভব করি। কারণ এই পথচলা কখনোই সহজ ছিল না। প্রতিটি ধাপে ছিল সন্দেহ, চ্যালেঞ্জ এবং অনিশ্চয়তা।
এই ১৪ বছরে আমরা অসংখ্য প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি। আমাদের বলা হয়েছে—এই স্কুল টিকবে না, এনজিও স্কুল বেশি দিন চলে না, ফ্রি পড়াশোনা মানেই ভালো পড়াশোনা হয় না, এখানে কোনো ভবিষ্যৎ নেই। বলা হয়েছে, দুই-এক বছর পর সব বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের পরিকল্পনা, সিস্টেম এবং সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অনেকেই মনে করেছে, এটি শুধু আবেগের জায়গা থেকে করা কাজ, যা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
কোভিডের সময় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে যায়। সবাই ধরে নিয়েছিল, এবার আর টিকে থাকা সম্ভব না। বলা হয়েছিল—ফান্ডিং বন্ধ হয়ে যাবে, ক্লাস বন্ধ হয়ে যাবে, বাচ্চারা আর ফিরবে না, পুরো সিস্টেম ভেঙে পড়বে। কিন্তু আমরা থামিনি। আমরা নতুনভাবে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি, পরিস্থিতির সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছি এবং ধীরে ধীরে আবার এগিয়ে গেছি।
শুরুটা ছিল আরও কঠিন। আমার বয়স তখন মাত্র বাইশ বছর। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা ছিল না। আমার সাথে যারা ছিল, তারা সবাই ভলান্টিয়ার। আমাদের বলা হয়েছিল—এই বয়সে এটা সম্ভব না, এই টিম দিয়ে এটা সম্ভব না। কিন্তু আমরা শিখেছি, ভুল করেছি, আবার শিখেছি এবং সামনে এগিয়ে গেছি।
এই যাত্রায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল একটি ভলান্টিয়ার টিমকে ধরে রাখা, তাদের গাইড করা, তাদের মধ্য থেকে লিডার তৈরি করা এবং একসময় সেই টিমকে প্রফেশনাল টিমে রূপান্তর করা। একই সাথে শৃঙ্খলা, ম্যানেজমেন্ট, দায়িত্ব বণ্টন এবং একটি কার্যকর সিস্টেম দাঁড় করানো ছিল প্রতিনিয়ত একটি কঠিন কাজ।
একাডেমিক উন্নয়নও ছিল বড় একটি দায়িত্ব। ছোট ক্লাস থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে উচ্চ শ্রেণিতে উঠতে হয়েছে। সিলেবাস, শিক্ষক, মান এবং মূল্যায়ন—সবকিছু নতুনভাবে সাজাতে হয়েছে। ক্লাস ফাইভ-সিক্স থেকে শুরু করে হাই স্কুল, তারপর এসএসসি লেভেল পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া, সায়েন্স, আর্টস, কমার্স বিভাগ চালু করা, যোগ্য শিক্ষক আনা এবং তাদের সম্মানী নিশ্চিত করা—সবকিছুই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
এই সবকিছুর পাশাপাশি ছিল ফান্ডিং-এর সংগ্রাম। প্রতিটি মাসে কিভাবে খরচ চলবে, কিভাবে শিক্ষক সম্মানী দেওয়া হবে, কিভাবে খাবার নিশ্চিত করা হবে, কিভাবে নতুন প্রোগ্রাম চালু করা হবে—এই প্রশ্নগুলো সবসময় ছিল। কখনো নিশ্চিততা ছিল না, কিন্তু বিশ্বাস ছিল। আর সেই বিশ্বাসই আমাদের চালিয়ে নিয়ে গেছে।
মানুষের প্রশ্ন থামেনি। বলা হয়েছে—এই স্কুল কি স্থায়ী, নাকি সাময়িক একটি প্রজেক্ট? এখানে পড়লে কি বোর্ড পরীক্ষায় বসা যাবে? সরকারি স্বীকৃতি পাওয়া যাবে? নিয়মিত ক্লাস হয়, নাকি শুধু নামমাত্র পড়ানো হয়? শিক্ষকদের যোগ্যতা কেমন? এখান থেকে কি অন্য ভালো স্কুলে ট্রান্সফার হওয়া যায়? সিলেবাস ঠিকমতো অনুসরণ করা হয়? এখান থেকে কি কলেজে ভর্তি হওয়া সম্ভব?
আরও প্রশ্ন এসেছে ভবিষ্যৎ ও মান নিয়ে। এনজিও স্কুলে পড়লে কি ক্যারিয়ার গড়া যায়? এখানে কি শুধু সুবিধাবঞ্চিত বাচ্চাদের রাখা হয়, নাকি তাদের প্রকৃত শিক্ষা দেওয়া হয়? পড়াশোনার মান কি অন্য স্কুলের মতো? হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ কী হবে? এখানে কি সত্যিকারের মূল্যায়ন হয়, নাকি শুধু দেখানো হয়?
এরপর শুরু হয়েছে সবচেয়ে কঠিন অংশ—রিউমার, ভয় এবং অপপ্রচার। বলা হয়েছে এখানে বাচ্চাদের রক্ত বিক্রি করা হয়, বিদেশে নিয়ে যাওয়া হতে পারে, কিংবা অন্য কোনো অজানা কাজে ব্যবহার করা হয়। কেউ বলেছে এই ধরনের প্রতিষ্ঠান নিরাপদ না, এখানে বাচ্চাদের অপব্যবহার হতে পারে, এমনকি তাদের ব্রেনওয়াশ করা হয়।
ধর্ম নিয়েও নানা প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বলা হয়েছে বাচ্চাদের ধর্ম পরিবর্তন করানো হয়, তাদের খ্রিস্টান বানিয়ে ফেলা হয়, বা কোনো বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে তাদের ব্যবহার করা হয়। কেউ সন্দেহ করেছে, এই উদ্যোগের আড়ালে গোপন উদ্দেশ্য আছে, যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না।
আরও অভিযোগ এসেছে স্বচ্ছতা নিয়ে। বলা হয়েছে বাচ্চাদের পরিচয়, ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে ফান্ড তোলা হয়, কিন্তু সেই অর্থ তাদের জন্য ব্যয় করা হয় না। কেউ আশঙ্কা করেছে, এই প্রতিষ্ঠানে দিলে বাচ্চারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে বা তাদের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
তবুও এই পুরো যাত্রায় আমি সবসময় অনুভব করেছি—আমরা একা না। এমন কিছু মানুষ আমাদের সাথে যুক্ত হয়েছেন, যারা হয়তো খুব বড়ভাবে সাহায্য করেননি, কিন্তু একদিনের জন্য, এক মুহূর্তের জন্য, মন থেকে পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমি তাদের কাউকেই ভুলিনি। কারণ এই যাত্রা শুধু অর্থ দিয়ে না, মানুষের ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং দোয়ার উপর দাঁড়িয়ে আছে।
আর আগামীকাল সেই দিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেব এসএসসি বোর্ড পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড। তারা এখন ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষার্থী।
এটি শুধু একটি কাগজ না—এটি ১৪ বছরের পরিশ্রম, ধৈর্য, সংগ্রাম এবং বিশ্বাসের একটি প্রমাণ।
আজ আমি শুধু একটাই কথা বলতে পারি—আমরা থামিনি, কারণ আমরা বিশ্বাস করতাম, একদিন আমরা আমাদের সব প্রশ্নের উত্তর কাজ দিয়েই দিতে পারব।



Comments
Post a Comment